মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে আলোচনায় শেখ হাসিনা: বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে চাঞ্চল্যকর মন্তব্য

 বিবিসিকে দেওয়া ই-মেইল সাক্ষাৎকারে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দাবি করেছেন যে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আলোচিত ‘আয়নাঘর’ বা গোপন বন্দিশালায় নির্যাতনের বিষয়ে তিনি কিছুই জানতেন না। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এসব গোপন নির্যাতনকেন্দ্র উন্মোচিত হলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো তাঁর সরকারকে দায়ী করে। তবে শেখ হাসিনা অভিযোগগুলো অস্বীকার করে বলেন, কোনো কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ থাকলে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদন্ত হওয়া উচিত। তাঁর অস্বীকার—নতুন করে জাতীয় বিতর্ক তৈরি করেছে। 

  


মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে আলোচনায় শেখ হাসিনা: বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে চাঞ্চল্যকর মন্তব্য 

 

গোপন নির্যাতন কেন্দ্র ‘আয়নাঘর’ নিয়ে আলোচনার ঝড় বহুদিন ধরেই চলছে। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সেই বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। এর মধ্যেই বিবিসিকে দেওয়া ই-মেইল সাক্ষাৎকারে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দাবি করেছেন, তাঁর সরকারের সময় গোপন বন্দিশালায় আটকে রেখে নির্যাতনের বিষয়ে তিনি “কিছুই জানতেন না”।

শুক্রবার (১৪ নভেম্বর) বাংলাদেশ সময় সকালে বিবিসি এই বিস্তৃত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যেখানে বলা হয়, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা হারানোর পর বেশ কয়েকটি গোপন নির্যাতনকেন্দ্র—জনপ্রিয়ভাবে যেগুলো ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিত—উন্মোচিত হয়। এসব স্থানে বছরের পর বছর ধরে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও বিরোধী কণ্ঠস্বরকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। 

আরও পড়ুন গণভোটে আইন প্রণয়ন হয় না”—জাতীয় জাদুঘরের সামনে বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিনের স্পষ্ট বার্তা

গোপন বন্দিশালার অভিযোগ ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১৫ বছরে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, আটক ও নির্যাতনের অভিযোগে বারবার সমালোচিত হয়েছে পূর্ববর্তী সরকার। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানিয়েছে।

দেশীয় রাজনৈতিক দলগুলোও ‘আয়নাঘর’কে আওয়ামী লীগ সরকারের একটি গোপন দমন–পীড়নের হাতিয়ার হিসেবে বর্ণনা করে আসছে। তবে এসব অভিযোগ কখনোই স্বীকার করেনি সরকার বা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।

শেখ হাসিনার অস্বীকার: “আমার ব্যক্তিগত সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ভিত্তিহীন”

বিবিসির প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন—
“আমার ব্যক্তিগত সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আমি অস্বীকার করছি। তবে যদি কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রমাণ থাকে, তাহলে নিরপেক্ষ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রক্রিয়ায় তদন্ত হওয়া উচিত।”

তিনি আরও দাবি করেন যে, গোপন বন্দিশালা পরিচালনা, বেআইনি আটক বা নির্যাতন–এসব বিষয়ে তাঁর কোনো সরাসরি তথ্য ছিল না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের মন্তব্য জনমনে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করবে। কারণ গত এক দশকে গুম–নির্যাতনের শিকার পরিবারের সদস্যরা সরাসরি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়কে দায়ী করে আসছেন।

মানবাধিকার সংস্থার অভিযোগ অস্বীকার

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বহু নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবার দাবি করেছেন যে, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর পরিচয়ে লোকজন তাঁদের আপনজনকে তুলে নিয়ে গেছে। অনেকেই ফিরে আসেনি। আবার কেউ কেউ মুক্ত হয়ে জানিয়েছে, অচেনা বেসমেন্টের মতো কক্ষে আটকে নির্যাতন চালানো হতো। এসবই পরে ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিত হয়।

তবে শেখ হাসিনা এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বিবিসিকে বলেন—
“গুম বা নির্যাতনের অভিযোগের কোনও সত্যতা পেলে তদন্ত হোক, তবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য যেন এর সঙ্গে জড়িত না থাকে।”

গণঅভ্যুত্থানের পর উন্মোচিত গোপন কক্ষগুলো

ক্ষমতা পরিবর্তনের পর বিভিন্ন স্থানে অনুসন্ধান চালিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিছু গোপন কক্ষ, সাউন্ডপ্রুফ রুম ও বিশেষ সেলের সন্ধান পায়। সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে উঠে আসে—এসব স্থানে রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্রনেতা, কর্মী, সাংবাদিকসহ অনেককে আটক রাখা হতো।

এই অনুসন্ধানের পর দেশব্যাপী নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়—
“এতোদিন এসব কীভাবে গোপন রইল? কে পরিচালনা করত? কার নির্দেশে চলত?”

সরকার, প্রশাসন ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন প্রশ্ন

শেখ হাসিনার অস্বীকার জনমনে দু’ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে—
১️⃣ যারা তাঁর বক্তব্যকে বিশ্বাস করছেন, তাদের যুক্তি—এত বড় প্রশাসনিক কাঠামোতে সবকিছু প্রধানমন্ত্রীর জানা সম্ভব নয়।
২️⃣ অন্যদিকে, বিরোধী রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো মনে করছে—এ ধরনের নির্যাতনকেন্দ্র দীর্ঘসময় পরিচালিত হতে হলে উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশ ছাড়া সম্ভব নয়।

ফলে বিতর্কের আগুনে ঘি ঢালার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।  

আরও পড়ুন  জুলাই চেতনা ও নতুন বাংলাদেশের পথে ডাকসু ভিপির স্পষ্ট বার্তা

জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা—জবাবদিহি কি সামনে আসবে?

বর্তমানে ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মানবাধিকার লঙ্ঘনের মামলাতেও শেখ হাসিনাকে প্রশ্ন করা হয়েছে বলে বিবিসি জানায়। সেখানে তিনি অভিযোগগুলোও অস্বীকার করেন।

অন্যদিকে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার বলেছে—
“গুম, নির্যাতন, বেআইনি আটক—সবই নিরপেক্ষ তদন্ত করা হবে। দায়ী কে, সেটা নিশ্চিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘আয়নাঘর’ ইস্যুটি তাই হয়ে উঠেছে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং ফয়সালাহীন একটি অধ্যায়।

নবীনতর পূর্বতন

যোগাযোগ ফর্ম